মানুষের জীবন রক্ষার অন্যতম প্রধান উপাদান ওষুধ। অথচ সেই ওষুধের মান নিয়ে সরকারি পরীক্ষাগারে গুরুতর অসংগতি ধরা পড়ার পরও পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ভূমিকা ঘিরে। মেসার্স বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের উৎপাদিত দুটি ওষুধের নমুনায় নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে ভিটামিন-ডি৩ কম পাওয়ার অভিযোগ এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের বাস্তবায়ন নিয়ে অনুসন্ধানে নতুন কিছু প্রশ্ন সামনে এসেছে।
এ ঘটনায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও লাইসেন্সিং অথরিটি মোহা. আলমগীর হোসেনের দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আর্থিক লেনদেন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
বক্তব্য চাইতে গিয়ে নতুন প্রশ্ন
এ বিষয়ে অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেনের বক্তব্য জানতে তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সরাসরি তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে তাঁর ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) মওদুদের সঙ্গে কথা হলে তিনি অভিযোগগুলোকে ‘ফেক নিউজ’ বলে মন্তব্য করেন। তখন প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, যেসব অভিযোগ ও সরকারি পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে অনুসন্ধান চলছে, সেগুলোকে ফেক নিউজ বলার পক্ষে অধিদপ্তরের কাছে কী ধরনের তথ্য বা ব্যাখ্যা রয়েছে?
জবাবে পিএস মওদুদ বলেন, মহাপরিচালক যে বক্তব্য দেবেন, তিনি সেটিই জানাবেন। পাশাপাশি তিনি অধিদপ্তরের মুখপাত্র হিসেবে পরিচিত আক্তার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার পরামর্শ দেন।
তাঁর এই বক্তব্যের পর স্বাভাবিকভাবেই কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সরকারি পরীক্ষাগারের পরীক্ষার ফলাফল কি অধিদপ্তরের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়? মানহীনতার অভিযোগে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি কী? আর যদি প্রতিবেদনটি অসত্য হয়, তাহলে তার বিপরীতে অধিদপ্তরের প্রকৃত তথ্য ও নথিপত্র কী?
পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে কী পাওয়া গিয়েছিল?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৬ এপ্রিল জাতীয় ঔষধ নিয়ন্ত্রণ পরীক্ষাগার (NDCL), মহাখালী, ঢাকার পরীক্ষায় বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের উৎপাদিত Maxcoral-DX Tablet এবং Maxcoral-D Tablet-এর নির্দিষ্ট দুটি ব্যাচে ঘোষিত মাত্রার তুলনায় ভিটামিন-ডি৩ কম পাওয়া যায়।
Maxcoral-DX Tablet-এর ব্যাচ নম্বর 5K17274-এ প্রতি ট্যাবলেটে ৪০০ IU থাকার কথা থাকলেও পরীক্ষায় পাওয়া যায় ২৭৩.৮১ IU। অন্যদিকে Maxcoral-D Tablet-এর ব্যাচ নম্বর 5K12276-এ ঘোষিত ২০০ IU-এর বিপরীতে পাওয়া যায় ১৩৫.৫২ IU।
প্রাপ্ত পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, উভয় নমুনাই নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করেনি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ওষুধের নিবন্ধন স্থগিত, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
নির্দেশের পরও ব্যবস্থা বাস্তবায়ন হলো কি?
অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট ওষুধের নিবন্ধন স্থগিত ও উৎপাদন-বাজারজাতকরণ বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন হয়েছে? বাজার থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যাচের ওষুধ প্রত্যাহার করা হয়েছে কি না? ঔষধ আদালতে মামলা দায়েরের নির্দেশ থাকলে সেই মামলার বর্তমান অবস্থা কী?
এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে অধিদপ্তরের মূল আদেশ, মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং বাজার থেকে ওষুধ প্রত্যাহারের প্রতিবেদন পরীক্ষা করা জরুরি।
‘সব মহল জানে, কেউ কিছু করতে পারে না’—এমন বক্তব্যের তাৎপর্য কী?
কথোপকথনের একপর্যায়ে পিএস মওদুদ আরও মন্তব্য করেন, এ ধরনের অনিয়মের বিষয় বিভিন্ন মহলে জানা থাকলেও কেউ কিছু করতে পারে না—এমন পরিস্থিতি রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তাঁর বক্তব্যের এই অংশটিও অনুসন্ধানের দাবি রাখে। কারণ, কোনো সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে যদি এমন পরিস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক—ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে বাধা কোথায়? কারা দায়ী? আর জনগণের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকর ভূমিকা পালন করছে কি না?
তবে এ বক্তব্যের সঠিক প্রেক্ষাপট ও অর্থ নিশ্চিত করতে পিএস মওদুদের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য এবং প্রয়োজনে তাঁর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নেওয়া প্রয়োজন।
দুদকে অভিযোগ, প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত
এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগের আবেদন দাখিল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, মামলা দায়ের না হওয়ার কারণ, সম্ভাব্য অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি কিংবা যোগসাজশের অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না। তাই অভিযোগের প্রতিটি বিষয় নথিপত্র, ব্যাংক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন: দায় নেবে কে?
ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু কাগজে-কলমে নির্দেশ জারি করা নয়; সেই নির্দেশ বাস্তবায়ন এবং জনগণের কাছে নিরাপদ ও মানসম্মত ওষুধ পৌঁছানো নিশ্চিত করাও তাদের দায়িত্ব।
সরকারি পরীক্ষাগারে কোনো ওষুধের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার পরবর্তী ব্যবস্থা কেন দ্রুত দৃশ্যমান হবে না? বাজারে সংশ্লিষ্ট ওষুধ পাওয়া গেলে তা প্রত্যাহারের দায়িত্ব কার? আর কোনো কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
দৈনিক সময়ের অনুসন্ধান অব্যাহত থাকবে। প্রয়োজনে অধিদপ্তরের মুখপাত্র আক্তার সাহেব, মহাপরিচালক মোহা. আলমগীর হোসেন, পিএস মওদুদ এবং বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে পরবর্তী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের আপস নয়। অভিযোগের সত্যতা উদঘাটনে প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ।