বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। চলতি বছর এখন পর্যন্ত এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে মশাবাহিত এই রোগে। একই সময়ে নতুন করে ১ হাজার ৯৯৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাব যুক্ত হওয়ার পর ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৮১ জনে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৯০ হাজার ৩৫৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৪ হাজার ২৯৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৭৭৬ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এক দিনে সর্বোচ্চ ১০ মৃত্যু
গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া ১০ জনের মধ্যে খুলনা বিভাগে তিনজন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় দুইজন, বরিশাল বিভাগে দুইজন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ও রাজশাহী বিভাগে একজন করে মারা গেছেন।
এর আগে চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা ছিল ৯ জন—৮ সেপ্টেম্বর। নতুন করে ১০ জনের মৃত্যু সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
সেপ্টেম্বর ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ মাস
চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ সময় ছিল সেপ্টেম্বর। ওই মাসে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৪৩ হাজার ৭৭৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আগস্টে যেখানে ডেঙ্গুতে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেপ্টেম্বরে সেই সংখ্যা বেড়ে ১৪৮-এ পৌঁছায়।
অক্টোবরেও পরিস্থিতির উন্নতির পরিবর্তে নতুন করে সংক্রমণ বাড়ছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ
ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় রাজধানীসহ বিভিন্ন হাসপাতালকে অতিরিক্ত শয্যার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। ঢাকার হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ সামলাতে অতিরিক্ত বেড বাড়ানো, প্রয়োজন হলে বিকল্প চিকিৎসা অবকাঠামো ব্যবহারের বিষয়ও বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে নির্ধারিত ডেঙ্গু ওয়ার্ডের বাইরে অন্যান্য জায়গাতেও রোগী রাখার চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
কেন বাড়ছে মৃত্যু?
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ডেঙ্গুতে মৃত্যুর পেছনে দেরিতে হাসপাতালে আসা, দেরিতে রোগ শনাক্ত হওয়া এবং বারবার ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার মতো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন।
ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চের (IEDCR) ১১৯টি মৃত্যুর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার এক দিনের মধ্যেই মারা গেছেন। পর্যালোচনায় ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যুর ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং ৩১ দশমিক ২ শতাংশের ক্ষেত্রে এক্সপ্যান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমের কথা উঠে এসেছে।
চিকিৎসকরা বলছেন, অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শুরুতে ডেঙ্গুর উপসর্গ স্পষ্ট নাও হতে পারে। ফলে সাধারণ জ্বর ভেবে চিকিৎসা নিতে দেরি হলে পরবর্তী সময়ে রোগীর অবস্থা দ্রুত সংকটজনক হয়ে উঠতে পারে।
চার ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসই দেশে সক্রিয়
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত জানিয়েছেন, বাংলাদেশে ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপই বর্তমানে শনাক্ত হচ্ছে। একই ব্যক্তি একাধিকবার ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে পরবর্তী সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ডেঙ্গু টিকার ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করার বিষয়টিও সরকার বিবেচনা করছে। তবে এ ধরনের ট্রায়াল শুরু করতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন লাগবে।
শুধু ফগিং নয়, প্রয়োজন প্রজননস্থল ধ্বংস
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু রাসায়নিক স্প্রে বা ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। এডিস মশার বংশবিস্তারের স্থান—জমে থাকা পানি, পরিত্যক্ত পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের পানি, ছাদ ও বাড়ির আশপাশের ছোট জলাধার—নিয়মিত পরিষ্কার করা জরুরি।
সাম্প্রতিক বৃষ্টিপাত এডিস মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। ফলে অক্টোবরজুড়েও ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
২৬ বছরের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ মৃত্যু
চলতি বছর ডেঙ্গুতে ২৮১ জনের মৃত্যু ইতোমধ্যে বাংলাদেশের গত ২৬ বছরের হিসাবের মধ্যে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বোচ্চ বার্ষিক মৃত্যুর সংখ্যা। এর আগে ২০২৩ সালে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭০৫ জন ডেঙ্গুতে মারা যান। ২০২৪ সালে মৃত্যু হয় ৫৭৫ জনের।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে বড় প্রশ্ন
একদিকে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ, অন্যদিকে ডেঙ্গুর প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণ ও রোগী শনাক্তকরণে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা হচ্ছে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর ইতোমধ্যে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ২৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতি আরও অবনতির আগেই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, পর্যাপ্ত হাসপাতাল শয্যা এবং গুরুতর রোগীদের জন্য নিবিড় চিকিৎসার ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি হয়ে উঠেছে।