দেশে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের। অপরাধ দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় আনা—এসব কাজের জন্যই রাষ্ট্র পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থাকে নিয়োগ দেয়। তাদের বেতন-ভাতা ও কার্যক্রম পরিচালনার ব্যয় বহন করে জনগণের করের অর্থে।
তাহলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে কেন অস্ত্র হাতে মাদকের আস্তানায় অভিযানে নামতে হচ্ছে—এমন প্রশ্ন উঠছে জনমনে।
কোনো জনপ্রতিনিধি বা সরকারি দায়িত্বশীল ব্যক্তির মাদকবিরোধী অবস্থান অবশ্যই আলোচনার বিষয় হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযানের ধরন, আইনগত এখতিয়ার এবং প্রশাসনের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়া জরুরি। একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির হাতে অস্ত্র নিয়ে অভিযানে নামার ঘটনা যদি সত্য হয়ে থাকে, তবে জানতে হবে—অভিযানটি কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে পরিচালিত হয়েছে, সেখানে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল এবং আইনগত প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না।
পুলিশ কি তাহলে দায়িত্ব পালন করছে না?
সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, অপরাধীদের গ্রেপ্তার, আলামত উদ্ধার এবং আদালতে অভিযোগের প্রমাণ উপস্থাপন পুলিশের দায়িত্বের অংশ। সেই দায়িত্ব পালনে কোনো ঘাটতি থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করতে হবে।
এমনকি কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠলেও তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। তবে অভিযোগ বা জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহের ভিত্তিতে পুরো পুলিশ বাহিনীকে মাদকের সঙ্গে জড়িত বলা যায় না। অপরাধে কোনো সদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
রাষ্ট্রের আইন কি ব্যক্তি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে?
দেশে অপরাধ দমনের জন্য সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামো রয়েছে। সেই কাঠামোর অধীনেই প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ করার কথা। কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে ব্যক্তিগত উদ্যোগ যদি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারের কাছে তাই প্রশ্ন—মাদকবিরোধী অভিযান কি নিয়মিত ও কার্যকরভাবে পরিচালিত হচ্ছে? পুলিশের কাছে কি পর্যাপ্ত তথ্য ছিল? সংশ্লিষ্ট এলাকায় আগে অভিযান হয়েছে কি না? হয়ে থাকলে মাদক কারবারিরা আবার সক্রিয় হলো কীভাবে? আর কোথাও প্রশাসনিক ব্যর্থতা থাকলে তার দায় নির্ধারণ করা হচ্ছে কি?
জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি চাই
জনগণ পুলিশ ও প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং নিরপেক্ষ সেবা প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণ না হলে প্রশ্ন উঠবেই। তবে সমাধান হতে হবে প্রমাণভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছতা, কার্যকর অভিযান এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহির মাধ্যমে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন: মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কি ব্যক্তিনির্ভর হবে, নাকি রাষ্ট্রের আইনগত প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে? মাদক কারবারি, তাদের পৃষ্ঠপোষক এবং অপরাধে জড়িত কোনো কর্মকর্তা থাকলে তাঁদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতা প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকাশ করতে হবে।
মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে শুধু অভিযান দেখানো যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন ধারাবাহিক আইন প্রয়োগ, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনের চোখে সবার সমান জবাবদিহি।